উপকূলীয় ব-দ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ ঝুঁকিপ্রবন দেশ। এদেশে ঝড়-বন্যা-নদীভাঙ্গনের মত দুর্যোগগুলো নতুন নয়; পুরনো-বহুদিনের। ঘটনাগুলো প্রাকৃতিক। তবে বিপজ্জনক হচ্ছে, প্রাকৃতিক এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে মানুষের অদূরদর্শী কিছু কর্মকান্ডের প্রতিক্রিয়ায় দুর্যোগগুলো আরও জোরালো ও তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক ঘটনার চেয়েও অপ্রাকৃত বা মানুষের কর্মকান্ডের প্রতিক্রিয়ায় যে ক্ষতি তা’ এই মানুষের সমাজেই আঘাত হানতে শুরু করেছে। এমনি একটি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন। আমরা এখন মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যে উপায় খুঁজে ফিরছি। উপকূলীয় জন-জীবন এই জলবায়ু পরিবর্তন-এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলভাগে দু’-দু’টি ঘূর্ণিঝড় -সিডর ও আইলা এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এমন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা আরও বাড়বে এবং সমানতালে বেড়ে যাবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। প্রকৃতপক্ষে, বায়ুমন্ডলে গ্রীন-হাউজ গ্যাসের (কার্বন-মনো-অক্সাইড ঈঙ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ঈঙ২, ক্লোরো-ফ্লোরো-কার্বন ঈঋঈ, সালফার ং, মিথেন ঈঐ৪ প্রভৃতি) পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর উষ্ণতা দ্রæতহারে বাড়ছে। আর উষ্ণায়ণের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। উপরন্তু গরমের প্রতিক্রিয়ায় সমূদ্রের পানির প্রসারণ (ঃযবৎসধষ বীঢ়ধহংরড়হ) ঘটছে। এর ফলে সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমূদ্রের এই বর্ধিত পানিরাশি উপকূল এলাকা ছাপিয়ে নেবে। বায়ুমন্ডলে এই উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমূদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ছাড়াও আরও কিছু পরিবর্তন ঘটছে। যেমন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কোথাও কমে যাওয়া, কোথাও বেড়ে যাওয়া; গরম এলাকায় গরম বেড়ে যাওয়া; আবার শীত-প্রধান এলাকায় শীতের প্রকোপ আরও বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি। অবশ্য, সাধারণভাবে আমরা জানি যে, ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের গড় আবহাওয়াকেই জলবায়ু বলা হয়। জলবায়ুর একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন রয়েছে; অতি মাত্রার গ্রীনহাউজ গ্যাস এই স্বাভাবিক পরিবর্তনকে এক অস্বাভাবিক বিপজ্জনক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সাধারণভাবে বিজ্ঞানীরা এই গোটা পরিবর্তনটিকে জলবায়ু পরিবর্তন বলছেন। ইউএনএফসিসি (ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) বা জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমূদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাসহ বিশ্বের উপকূলীয় দেশগুলোর এক বিরাট অংশ তলিয়ে যাবে।
প্রশ্নটি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে দায়ী যে গ্রীনহাউজ গ্যাস তা কারা ছাড়ছে এবং কেন-ই-বা তারা এই গ্যাস ছাড়া বন্ধ করছে না? উন্নত তথা ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলোই এই অতিরিক্ত মাত্রার গ্রীনহাউজ গ্যাস ছাড়ছে। ধনী দেশগুলোর শিল্প-কল-কারখানা এবং সেই দেশগুলোর নাগরিকদের আরাম-আয়েশের জন্যে ব্যবহৃত গাড়ী, ফ্রিজ, এয়ার-কন্ডিশন প্রভৃতি থেকে এই গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গত হচ্ছে। আর ধনী দেশগুলোর এই আরাম-কান্ডের বিষে আমাদের মত উপকূলীয় গরীব দেশগুলোর বিপন্নতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। উন্নত দেশগুলোর বিলাসিতার দায়ে আমরা জ্বলে-পুড়ে মরতে বসেছি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপন্নতা থেকে কিভাবে রক্ষা বা মোকাবেলা করা যায়, তা নিয়ে দুনিয়াব্যাপী জোর আলোচনা চলছে। ধনী দেশগুলোর বিলাসিতায় গরীবদেশগুলো কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিয়েও দুনিয়া-জুড়ে তর্ক-বিতর্ক, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও আলাপ-আলোচনার কমতি নেই। আলোচনায় মূখ্য তিনটি বিষয় উঠে এসেছে; এক, ক্ষতিকর গ্রীনহাউজ গ্যাসের উদগীরণ কমিয়ে আনা (ৎবফঁপব মৎববহ-যড়ঁংব মধং বসরংংরড়হ); দুই, গ্রীনহাউজ গ্যাসের জন্যে দায়ী ধনী দেশগুলোকে ক্ষতির শিকার দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা (সরঃরমধঃরড়হ) এবং তিন, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো পরিবর্তিত অবস্থার সাথে মানিয়ে নেয়া বা খাপ খাওয়ানো (ধফধঢ়ঃধঃরড়হ), যাকে অভিযোজনও বলা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর এই ক্ষতিকর পরিবর্তন মোকাবেলা সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনায় জাতিসংঘ নেতৃত্ব দিচ্ছে। বহুপাক্ষিক এই আলোচনার শুরু ২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত বালি সম্মেলনে। আশা করা হচ্ছে, ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের ৭ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত ডেনমার্কে অনুষ্ঠিতব্য কোপেনহেগেন সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে একটি নতুন কার্যকর চুক্তিতে উপনীত হতে পারবে। অবশ্য, এই আলোচনায় ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা না কমিয়ে অভিযোজনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু গ্রীনহাউজ গ্যাস নি:সরণের মাত্রা না কমিয়ে শুধুমাত্র অভিযোজনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিক্ষর প্রতিক্রিয়া মোকাবেলা করা অসম্ভব। এ কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২০ সেলসিয়াসের নিচে রাখার জন্যে দাবি উঠেছে। ধনী দেশগুলোকে এ লক্ষ্যে ২০২০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের নিঃসরণকে ভিত্তি ধরে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৪০ ভাগ গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া, অধিক নিঃসরণকারী কতিপয় উন্নয়নশীল দেশকেও (ব্রাজিল, চীন, ভারত প্রভৃতি দেশসমূহ) একই সময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে নিঃসরণ কমিয়ে আনতে হবে।
অবশ্য, শুধুমাত্র দাবি তোলা নয়, আমাদের জন্যে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজনও একটি বড় বিষয়। যেহেতু অভিযোজনের একটি সীমা আছে এবং জলবায়ূ পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া এড়ানোর কোন সুযোগ নেই; একারণে বিপুল সংখ্যায় দরিদ্র জনগণ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যার আলামত হিসেবে আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশী, দাকোপ উপজেলার সুতারখালী এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এলাকা ত্যাগ করেছেন। ওই এলাকার অনেকেই মনে করেন, ওখানে আর বসবাস করা যাবে না। সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির উদাহরণ হিসেবে গাবুরাকে দেখানো হচ্ছে। একারণে উপকূলীয় এলাকায় নোনা বা জোয়ারের পানি ঠেকানোর জন্যে বাঁধ আরও উঁচু ও শক্ত করে দেওয়ার দাবি উঠেছে। যদিও আমাদের উপকূলভাগের পশ্চিমাংশ (সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর ও বরগুণা), বিশেষত: সাতক্ষীরা ও খুলনার গাঙ্গেয় প্লাবনভূমিতে ভূমি গঠনের প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই পোল্ডার ব্যবস্থা তৈরী করায় এর বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় জলাবদ্ধতার মত দুর্যোগের সৃষ্টি করা হয়েছে। আবার, মুনাফার কারণে সেই বাঁধ শত শত জায়গায় কেটে চিংড়ি চাষীরা নোনা পানি তুলতে গিয়ে বাঁধের যথেচ্ছ ক্ষতি করেছে।
তবে এটি নিশ্চিত যে, গ্রীনহাউজ গ্যাসের কারণে ভূ-মন্ডল উষ্ণতাজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমরা বাংলাদেশের জনগণ মোটেই দায়ী নই। তবে, আমরা কেন ধনী দেশের ভোগ-বিলাসিতার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্ভোগ পোহাবো? সারা বাংলাদেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা এই প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন। ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল রুরাল লাইভলিহুডস (সিএসআরএল) বা গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের জন্যে প্রচারাভিযান দেশব্যাপী এই প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের উপজেলা পর্যায়ে ৫১টি, বিভাগীয় পর্যায়ে ৭টি শুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে। জলবায়ু দারিদ্র্য শুনানী নামে একটি প্রতীকী আদালতের মত করে অনুষ্ঠিত এসব জনসমাবেশে ক্ষতিগ্রস্তরা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচিত প্যানেল ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য শুনে তাঁদের রায় বা মতামত সুপারিশ আকারে তুলে ধরেছেন। এছাড়াও নোয়াখালীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ জলবায়ু ক্যাম্প। পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান)-এর আয়োজনে এই ক্যাম্পে দেশের ৫১ জেলার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা-জাতি-লিঙ্গের ১১৫ তরুণ প্রতিনিধি অংশ নেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দেশের ভূমিকা ও করণীয় কি হতে পারে সেব্যাপারে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের মতামত তুলে ধরেছে।
জলবায়ু দারিদ্র্য শুনানি ও জলবায়ু ক্যাম্পে বক্তারা জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, এর উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হিমালয় পর্বতে বরফ গলার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও বেশি ঢলের পানি আসবে। এই পানি প্রবাহ রক্ষার জন্য আমাদের নদীগুলোর ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে, ড্রেজিং করতে হবে। ভাটির দেশ হিসেবে এই পানি আসার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি পানিকে সাগরে গিয়ে পড়তেও দিতে হবে। প্যানেলিস্ট, বক্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সকলেই একমত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণের কোনো ভ‚মিকা নেই। দেশের ভিন্ন ভিন্ন কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলে প্রান্তিক জনগণ জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর ভেতর লড়াই করে জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রেখেছেন। একারণে, জলবায়ু সংক্রান্ত জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা-উদ্যোগ-শিক্ষা-গবেষণা কার্যক্রমে এই মানুষদের সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভ‚ক্ত করতে হবে; জলবায়ু পরিবর্তনকে বাংলাদেশের জনগণের জীবনমান ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক প্রধান হুমকি হিশেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সমন্বিত যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে ন্যায্য নীতিগত রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।
বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাস কমিয়ে আনার লক্ষ্যে শুনানী ও ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, এই শতকে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা প্রাকশিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দেয়া চলবে না; বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ ৩৫০ পিপিএম (ঢ়ধৎঃং ঢ়বৎ সরষষরড়হ) নিরাপদ মাত্রায় নামিয়ে আনতে হবে; ২০১৫ সালের পর বায়ুমন্ডলে আর কোনভাবেই গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বাড়তে দেয়া চলবে না। সেজন্য বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের নির্গমনের তুলনায় ৯৫% কমানোর জন্য উন্নত রাষ্ট্রসমূহকে বাধ্য করতে হবে। কার্যকর মাত্রায় মিটিগেশন বা নির্গমন হ্রাস করতে ধনী শিল্পোন্নত (চুক্তির ভাষায় এ্যানেক্স-১) দেশগুলো কর্তৃক বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন ২০২০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের নির্গমনের তুলনায় ৪৫% কমাতে হবে। অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও (ভারত, চীন, ব্রাজিল প্রভৃতি) নির্গমন কমাতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশসহ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো স্বতঃপ্রণোদিতভাবে যদি নির্গমন হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেয় সেক্ষেত্রে তাদেরকে অর্থায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিসহ সকল ধরনের সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সহায়তা দেবার কারণে ওইসব দেশে হ্রাসকৃত নির্গমন ধনী শিল্পোন্নত দেশের নির্গমন হ্রাসের সাথে যোগ করে হিসেব করা চলবে না।
দেশের উপকূলীয় এলাকার পক্ষে খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে ১৪ নবেম্বর জলবায়ু দারিদ্র্য শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার শহরবানু খাতুন, বরগুনার তালতলী উপজেলার আমীর হোসেন মাঝি, খুলনার কয়রা উপজেলার মুর্শিদা খাতুন, খুলনার দাকোপ উপজেলার চিত্তরঞ্জন রায়, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার জাহানারা বেগম এবং কয়রায় বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রবিন মুÐা বক্তব্য দেন। এদের বক্তব্যের সাথে প্যানেল সদস্যরা একমত পোষণ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতিমধ্যে উপক‚লীয় জনগণের যে ক্ষতি হয়ে গেছে এবং নিকট ভবিষ্যতে যে দুর্ভোগ পোহাতে হবে তার জন্য অবিলম্বে দায়ী ধনী দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ক্ষতিপূরণের এ অর্থ ঋণ কিংবা সাহায্য নয়, বরং ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচিত হতে হবে। ইতিমধ্যেই উপক‚লের অনেক এলাকা পুরোপুরি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ অভিবাসন করতে বাধ্য হচ্ছে। এইসব জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে ধনী শিল্পোন্নত দেশে বৈধভাবে অভিবাসন করতে দিতে হবে; এ সংক্রান্ত তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবিসহ আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভূক্তি বাতিল করতে হবে; জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানোর জন্য বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শিল্পায়ন ও টেকসই কৃষি বিষয়ক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বিনামূল্যে হস্তান্তর করতে হবে। কৃষি-প্রযুক্তি হস্তান্তরের নামে বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে; এবং আসন্ন কোপেনহেগেন সম্মেলনে নেয়া ক্ষতিপূরণ দান ও নির্গমন হ্রাসের চুক্তি/সিদ্ধান্ত আগের মতো ঐচ্ছিক নয় বরং বাধ্যতামূলক হবে এবং এর আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। খুলনায় অনুষ্ঠিত শুনানীতে প্যানেলিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির, অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মনিরুল ইসলাম, খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ কে হিরু এবং উন্নয়ন ও মানবাধিকার কর্মী আ্যডভোকেট সৈয়দা সাবিহা। এতে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন খুলনা সিটি মেয়র, আওয়ামী লীগ খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা-২ আসনের এমপি, বিএনপি খুলনা মহানগর শাখার আহŸায়ক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। নোয়াখালী অনুষ্ঠিত ক্যাম্পে প্রধান অতিথি ছিলেন জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রæপের সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সঞ্জয় কুমার অধিকারী, পৌর মেয়র হারুনুর রশীদ আজাদ, অক্সফ্যাম’র কার্স্টি হিউস, মিশেল এংলেড, জিয়াউল হক মুক্তা, ডানিডা’র রেশাদ আলম ও প্রান-এর প্রধান নির্বাহী নূরুল আলম মাসুদ।
খুলনা ছাড়াও আঞ্চলিক পর্যায়ের অন্য শুনানীগুলো হয়েছে যশোর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, সিলেট, গাজীপুর ও খাগড়াছড়িতে। এসব শুনানিতেও জলবাযু পরিবর্তন মোকাবেলায় সবচেয়ে আলোচিত প্রসঙ্গ অভিযোজন বা এডাপটেশন বা খাপ খাওয়ানো নিয়ে কথা হয়েছে। এডাপটেশনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেয়ার কোন বিকল্প নেই। একারণে সকল শুনানী, ক্যাম্পে ও অনুষ্ঠিত সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, স্থায়িত্বশীলতা, নারী সংবেদনশীলতা, জনগোষ্ঠীনির্ভরতা আর স্থানীয় ও লোকজ জ্ঞান নির্ভরশীলতাকে অগ্রাধিকার দেবার ব্যাপারে বাংলাদেশকে জাতীয় ও আন্তজার্তিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার আহŸান জানানো হয়। বলা হয়, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় শিল্পোন্নত দেশগুলোকে বছরে বার্ষিক জিডিপির ১.৫ ভাগ প্রদান করতে হবে। উপরন্তু, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রযুক্তি গবেষণা, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা এবং হস্তান্তরে উন্নত দেশগুলোকে সকল ধরনের সহায়তা দিতে হবে। এবং সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়। এছাড়া, স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক অভিযোজন ও নির্গমন হ্রাস প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে মেধাসম্পদ চুক্তি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থেকেও সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিতে হবে। #
গৌরাঙ্গ নন্দী
খুলনা; নবেম্বর ২১, ২০০৯
