ব্রক্ষ্মপুত্রের উজানে আরও ছোট-বড় ’ফারাক্কা’

China-Dam-e1771211965813.avif

গৌরাঙ্গ নন্দী

আমাদের ব্রক্ষ্মপুত্রের উজানে ভারত আরও একাধিক জল-বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে, এতে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে। হ্যাঁ, দাবিটা সঠিক। তবে এই সঠিকতার আড়ালে ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় না নেওয়ার যে উন্মত্ততা দেখা দিয়েছে; সেটিই ভয় ও উদ্বেগের। উজানের এই জল-বিদ্যুতগুলো ভাটির দেশ হিশেবে আমাদের জন্য যেমন ক্ষতিকর; তেমনি এই অঞ্চলের বিশেষ ভূ-প্রকৃতির জন্য খুবই বিপজ্জনক। অবশ্য,তিব্বতে ইয়ারলু সাংপোতে বিশ্বের বৃহত্তম ড্যাম তৈরি করার চীনা পরিকল্পনা ভারতের এই প্রতিযোগিতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। উজানের এই দুটো দেশের প্রতিযোগিতা ভাটির দেশ হিশেবে আমাদের সবচেয়ে ভোগান্তির মুখে ফেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। 

তিব্বতের ইয়ারলু সাংপো ভারতের অরুনাচল প্রদেশে এসে সিয়াং নামে পরিচিত হয়েছে; আসামে সেই নদীর নাম ব্রক্ষ্মপুত্র, ভাটিতে আমাদের দেশেও সেই একই ধারার নাম ব্রক্ষ্মপুত্র। বিস্ময়কর হচ্ছে, ইয়ারলু সাংপোয় বাঁধের কারণে ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে; সেই ভারত একই ধরণের বাঁধ সিয়াংএ তৈরি করছে। এ ধরণের উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত নিজেকে চীনের ভূমিকায় দাঁড় করিয়েছে। ভারত যে কারণে, যে উদ্যোগের ফলে ভাটির দেশ হিশেবে নিজের (ভারত) ক্ষতি হবে আশঙ্কায় চীনের সমালোচনা করছে; বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, সে একই আচরণ করছে তার ভাটির দেশ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। অবশ্য,ভাটির দেশ হিসেবে, সবচেয়ে বিপদের আশঙ্কার মধ্যে থাকা বাংলাদেশ চীন বা ভারতের উদ্যোগ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কোন উদ্বেগ জানিয়েছে বলে দৃশ্যমান হয়নি।    

চীনের এই বড় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পটিকে ভারত পানিকে অস্ত্র হিশেবে এবং নিয়ন্ত্রণকারী হিশেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ এবং কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে, চীনভারতের অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি করতেউজানের নদীর উপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। এই প্রকল্পগুলিকে অস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করা হবে। উজানের জল নিয়ন্ত্রণ করে আচমকাই চীন বিপুল পরিমাণে জল ছেড়ে দিতে পারে; যার ফলে অরুণাচল ও আসামে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতিকে তারা ’জলবোমা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের উদ্বেগের মধ্যে ভাটির দেশ হিশেবে বাংলাদেশ বিবেচনায় আসেনি; কারণ, তারাও ফারাক্কা, তিস্তায় বাঁধ দিয়ে জল নিয়ন্ত্রণ বা সরিয়ে নিয়ে ব্যবহার করে, তখন বাংলাদেশ জল পায় না; আবার বর্ষার সময় সেখানকার অতিরিক্ত জমা জল ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশে অকাল বন্যার সৃষ্টি করে। আটকে রাখা জলকে তারাও অস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করে। 

চীনের বাঁধ তৈরির সমালোচনা করে ভারত আরও বলেছে যে, শুষ্ক মৌসুমে চীন জল আটকে রাখতে পারে, যাতে ভাটিতে প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, বাঁধটি তৈরি হওয়ার পর সিয়াং এবং ব্রহ্মপুত্র নদী শুকিয়ে যেতে পারে। যা স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার বড় ধরণের হুমকি তৈরি করতে পারে। এক সরকারি বিশ্লেষণে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে যে, চীনের বাঁধের কারণে গুয়াহাটির মতো একটি প্রধান আঞ্চলিক শহরেও জল প্রবাহ ২৫% কমে যেতে পারে। উপরন্তু, চীনের বাঁধটি একটি ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নির্মিত হচ্ছে; যা ভূমিধস, হঠাৎ হিমবাহ ফেটে যাওয়া বা কাদা ধসের মতো ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা ভাটির অঞ্চলগুলির জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

ভারত এসব কারণে চীনের এই বাঁধ তৈরির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে; পাশাপাশি তারা ভাটির দেশগুলির সাথেস্বচ্ছতা পরামর্শেরপ্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে। এছাড়া ভারত দাবি করেছে যে, ওই বাঁধ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের যে কোন ক্ষতি হবে না, তা চীনকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।  

এতোসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পরেও ভারত একই ধরণের বাঁধ নির্মাণের পাল্টাউদ্যোগ নিয়েছে। যাকে বলা যায়, ‘বাঁধের জন্য বাঁধপদ্ধতি। ভারত দাবি করছে যে, মূলত প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে অরুণাচল প্রদেশে বিশাল অভ্যন্তরীণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যাকে তারা ‘কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাএবং চীনের সম্ভাব্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেপ্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাহিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই প্রতিরক্ষামূলক কর্মসূচীর অংশ হিশেবে দিবাং বহুমুখী প্রকল্প ও উচ্চ সিয়াং বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।  

দিবাং বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত ,৮৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের এই বাঁধটি হবে সর্বোচ্চ কংক্রিট মাধ্যাকর্ষণ বাঁধ। ২০৩২ সালের মধ্যে এটি কার্যকর হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, উচ্চ সিয়াং বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত ১১.গিগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে চায়। এটি হবে ভারতের বৃহত্তম বাঁধ। এই বাঁধগুলির মাধ্যমে আনুমানিক ৯ বিলিয়ন ঘনমিটার জল ধারণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে চীনা বাঁধের প্রতিকুল প্রভাব নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে চীন থেকে আকস্মিক, অতিরিক্ত জল নিঃসরণ শোষণ করতে পারবে, যাতে বিপর্যয়কর বন্যা রোধ করা যাবে। আবার চীন যদি পানি প্রবাহ অন্যদিকে সরিয়ে নেয় বা আটকে রাখে, তাহলে ভারত বর্ষা মৌসুমে নদীর প্রবাহ পুনরায় নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।  

বাঁধের বিনিময়ে বাঁধনির্মাণের এই কৌশলের মাধ্যমে ভারত ভাটির দেশ -বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরি উপেক্ষা করছে। তারা চীনা বাঁধের কারণে যে যে ক্ষতির আশঙ্কা করছে, সেই সেই ক্ষতিগুলো দ্বারা বাংলাদেশও আক্রান্ত হবে। উপরন্তু ভারতের তৈরি একাধিক বাঁধের কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশ আরও বিপদের মুখোমুখি হবে। বাংলাদেশ এমনিতেই ফারাক্কা ও তিস্তা বাঁধের কারণে নানামুখী পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার। ফারাক্কার প্রভাবে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাগরের নোনা পানির অুনপ্রবেশ বেড়েছে; মরুময়তা দেখা দিয়েছে; নদী মরছে। তেমনিভাবে তিস্তার কারণে ভাটিতে পানি প্রবাহ কমেছে এবং উজানে আটকে রাখা বৃষ্টির পানি আচমকা ছেড়ে দেয়ায় তিস্তা অববাহিকায় বন্যা প্রায় নিয়মিত ঘটনা হিশেবে দেখা দিয়েছে। 

শুধুমাত্র ভাটির দেশেই নয়, তাদের দেশেও এই বাঁধগুলো প্রাকৃতিক ও সামাজিকভাবে মহাবিপর্যয়কর হিশেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ওই এলাকায় হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা, বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশের আদি উপজাতি, বা ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার মানুষেরা স্থায়ীভাবে স্থানচ্যুতির (মাইগ্রেট) আশঙ্কা করছে। উপরন্তু তাদের কাছে, তাদের পবিত্র ভূমি হতে উচ্ছেদের চেষ্টা হিশেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়রা সিয়াং নদীকে মা, স্থানীয় ভাষায় ’আনে’ বলে থাকে। আর পরিবেশগত সমস্যাত রয়েছেই; যা এক মহাবিপর্যয় ঘটাতে পারে। 

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকা, বিশেষ করে হিমালয়, অরুণাচল প্রদেশ এবং তিব্বতের যেসব অঞ্চলে বড় বড় বাঁধ প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছে বা চলছে, সেই স্থানটি ভূমিকম্পপ্রবণ। ভূতাত্তিকভাবে স্থানটি অস্থির এবং ভূমিকম্পের দিক দিয়ে সক্রিয় অঞ্চল। এই অঞ্চলে অতীতে বড় ধরণের ভূমিকম্প হয়েছে; যেমন ১৯৫০ সালের আসামতিব্বতের ভূমিকম্প, যার মাত্রা ছিল .৭। এর আগে, ১৭৬২ সালের ২রা এপ্রিল . মাত্রার ভূমিকম্প ব্রহ্মপুত্র নদীর প্রধান প্রবাহকে একটি বড় পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেয়; যাতে মধুপুর নদীর টেকটোনিক উত্থান ঘটে; এর প্রতিক্রিয়ায় যমুনা প্রবাহ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ভারতের দিবাং বাঁধ এলাকায় ইতোমধ্যে ৪. মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।

বলাইবাহুল্য, উজানে -ইয়ারলু সাংপোতে চীনের মেগাবাঁধ তৈরির স্থানটি ভূমিকম্পের ফল্ট লাইনের বিস্তৃত অঞ্চল। ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে এই বাঁধ নির্মাণের ফলে ভূমিধস; আচমকা হিমবাহ ফেটে যাওয়া এবং কাদা ধস ঘটাতে পারে। চীনের বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগএকেবারে ন্যায্যহলেও ভারতও সেই একই পথে হেঁটে গোটা অঞ্চলটি আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের দিবাং ও সিয়াং বহুমুখী প্রকল্প দুটো একই ধরণের ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বৃহৎ সংরক্ষণাগার বাঁধ নির্মাণের পরে ভূমিকম্প বা অতি-বৃষ্টিতে পানি যদি সংরক্ষণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে বাঁধ রক্ষায় পানি ছেড়ে দিলে মানবসৃষ্ট বন্যা দেখা দিতে পারে। যা আমরা ভারতের তিস্তা বাঁধ এলাকায় মাঝেমধ্যে দেখে থাকি। সার্বিকভাবে, এই বাঁধের প্রতিযোগিতা হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র এবং এই অঞ্চল তথা ভাটিতে বসবাসকারী মানুষের জন্য বিধ্বংসী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। যেখানে মানবজাতির উন্নয়নের জন্য পারষ্পরিক প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে আমরা আজ রাজনৈতিক বিবেচনায় পারষ্পরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানব জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। হায়! #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top