আমরা কী নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে যথাযথভাবে হাঁটছি !

RE-Image-01.webp

গৌরাঙ্গ নন্দী

প্রতি বছর ২৬শে জানুয়ারী আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি (সবুজ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি) দিবস পালিত হয়। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপান্তরের আহ্বান জানানোর মধ্যে দিয়ে দিনটি পালনের সূচনা হয়। জলবায়ু সংকট, জ্বালানি সমতা, এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা – এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাই এর লক্ষ্য। কারণ, আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উৎসগুলোর অন্যতম প্রধান ক্ষেত্রটি হচ্ছে জ্বালানি; বিশেষত: জীবাশ্ম জ্বালানি। এ কারণে জীবাশ্ম জ্বালানি হতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তথা সৌর, বায়ু এবং জলবিদ্যুতের মতো সবুজ বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের কথাটি জোরেশোরে বলা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এতে বিশ্ব উষ্ণায়ন যেমন সীমিত রাখা সম্ভব হবে; তেমনি এই গ্রহের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করার কার্যকর পদক্ষেপটি গৃহীত হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি কী শুধুমাত্র নৈতিক পছন্দের বিষয়? না, তা নয়। এটি আর্থিক দিক দিয়েও একটি পছন্দের বিষয়। আমরা সকলেই জানি যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ, জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের তুলনায় তিনগুণ বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানীয় পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ ব্যবহার করা হয়, যাতে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমে আসে এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়।

দেশে, বর্তমানে জ্বালানি পরিস্থিতি কী? আমাদের দেশটি ইতোমধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে। তবে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন-ক্ষমতার প্রায় ৪৪% শতাংশ আসে গ্যাস হতে। তবে, গার্হস্থ্য গ্যাসের মজুদ কমে গেছে, যে কারণে সরকারকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কয়লা হতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ২৫% শতাংশ কয়লা, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ২% শতাংশ। উচ্চমূল্যের ফার্নেস তেল এবং ডিজেল এখনও প্রায় ২৩% শতাংশ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা থাকা সত্ত্বেও, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনও খুবই কম। ২০২৬ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত, সৌর, বায়ু এবং জল মিলিয়ে মোট বিদ্যুৎ-উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৪% শতাংশ থেকে ৫.৫% শতাংশ মাত্র। সৌরশক্তি হল বৃহত্তম নবায়নযোগ্য উৎস, যেখানে বেশ কয়েকটি বৃহৎ আকারের সৌর পার্ক এবং তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে রুফটপ সোলার কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। বায়ুশক্তির অবস্থান মাত্র ১% শতাংশেরও কম।

বাংলাদেশ এখন জ্বালানি ক্ষেত্রে তিন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। এগুলো হচ্ছে: নিরাপত্তা, সমতা এবং স্থায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা। যেহেতু প্রচুর জ্বালানি (এলএনজি এবং কয়লা) এখন আমদানি করা হয়, তাই বিশ্বব্যাপী এর মূল্যের অস্থিরতার কারণে সরকারের উপর বিশাল ভর্তুকির বোঝা সিন্দাবাদের ভুতের মত চেপে বসেছে। চলতি অর্থ-বছরে (২০২৫-২৬) এলএনজি আমদানীতেই ৫৫০ বিলিয়ন বা ৫৫ হাজার কোটিরও বেশী টাকা খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত অর্থ-বছরে (২০২৪-২৫) এই খরচের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার মতো। যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ পড়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে, সরকার মাঝে মাঝে আমদানি কমিয়ে ফেলে, যার ফলে লোডশেডিং দেখা দেয়, যা শিল্প ও গৃহস্থালির উপর প্রভাব ফেলে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০% শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০% শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্জনের লক্ষ্যমাত্র্য নির্ধারন করেছে। যদিও সরকারের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সংজ্ঞায় পারমাণবিক শক্তি (রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র) এবং কার্বন ক্যাপচার এন্ড স্টোরেজ (সিএসএস)-র মতো উন্নত প্রযুক্তির কথা বলা হয়; প্রকৃতপক্ষে এগুলো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নয়।

আমাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি)-এর অধীনে, আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে একটি পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমরা ২০২৫এর শেষের দিকে জাতিসংঘে জমা দিয়েছি। এতে আমরা সকল ক্ষেত্রে (জ্বালানি, শিল্প, কৃষি, ইত্যাদি) গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাবো বলেছি। অবশ্য, গ্রিন হাউস গ্যাস কমানোর এই বিষযটি দুটো ভাগে বিভক্ত। এক, নিজেদের চেষ্টায় বা শর্তহীনভাবে কমানো; এবং দুই, শর্তসাপেক্ষে কমানো বা সহায়তা পাওয়া সাপেক্ষে কমানো। এক্ষেত্রে দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করে শর্তহীনভাবে কমানোর লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৬.৭৩% শতাংশ। আর আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া সাপেক্ষে আরও ১৫.১২% শতাংশ  নির্গমন কমানো হবে। এই মিলিয়ে মোট ২১.৮৫% শতাংশ নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপরন্তু, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস হতে ২০% শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বলে উল্লেখ করেছে।

এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য, এনডিসি পথ-নকশায় (রোডম্যাপ) ৯১১ মেগাওয়াটেরও বেশি নতুন নবায়নযোগ্য প্রকল্প (নিঃশর্ত) স্থাপন করা হবে। এবং শর্তসাপেক্ষ সহায়তা পাওয়া গেলে এই লক্ষ্যমাত্রা  সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বা তারও বেশী সম্প্রসারণ করা যাবে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়াও প্রায় ৬ হাজার সৌর সেচ পাম্প স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে; যাতে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং কৃষিক্ষেত্রের জন্য প্রায় ১৭৬ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন করবে। এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, বর্তমান সময় (জানুয়ারি ২০২৬) পর্যন্ত, নবায়নযোগ্য শক্তি মাত্র ৫% শতাংশের কাছাকাছি। অবশ্য, এটিও ঠিক যে এনডিসি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ২০৪১ সাল পর্যন্ত বার্ষিক আনুমানিক ১.৭ বিলিয়ন (একশ’ সত্তর কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিনিয়োগ খুবই হতাশাজনক। যদিও বৃহত্তর বিবেচনায় গ্রীন বা সাসটেইনেবল ফিনান্স বা টেকসই অর্থায়ন মোটামুটি। কিন্তু   টেকসই অর্থায়নের (সাসটেইনেবল ফিনান্স) মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ খুবই কম। ২০২৫ সালে, বাংলাদেশে টেকসই অর্থায়ন ১ দশমিক ৪৯ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি পৌঁছেছে; যা আগের বছরের তুলনায় ৬৯% শতাংশ বেশি। অথচ সেখানে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে অর্থায়ন বেড়েছে ২% শতাংশ হতে মাত্র ৭% শতাংশের মতো। আবার বেশিরভাগ ‘সবুজ’ অর্থ প্রকৃতপক্ষে সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিনিয়োগ হয়নি; বিনিয়োগ হয়েছে টেক্সটাইল (গার্মেন্টস)) বা ইটভাটা আধুনিকায়নের নামে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে। উল্লেখ্য, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা (২০% শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি) অর্জনের জন্য আমাদের বছরে প্রায় ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বা এগারো হাজার পাঁচশ’ কোটিরও বেশী টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে, বার্ষিক বিনিয়োগ মাত্র ২৩৮ মিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ অবিলম্বে ৪ থেকে ৬ গুণ অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন।

অবশ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) বেশ কিছু সহজ শর্তের ঋণ তহবিল তৈরি করেছে। এরমধ্যে রয়েছে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) এবং রপ্তানিমুখী শিল্পগুলিকে সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলার (মার্কিন ডলার/ইউরো) তহবিল। মোট এক হাজার কোটি টাকার এই তহবিল, যা ৫% শতাংশেরও কম সুদে বিতরণ করার কথা; কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি যে, এগুলো যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এরমধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলির ব্যবহারের হার একেবারে শূন্য শতাংশের কাছাকাছি। তবে ইডকল (অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থা লিমিটেড) একমাত্র ব্যতিক্রমী একটি প্রাথমিক নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, যারা সফলভাবে সোলার হোম সিস্টেমে অর্থায়ন করেছে। তারা এখন বৃহৎ আকারের রুফ-টপ সৌর-বিদ্যুৎ এবং গ্রিড-টাইড প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে।

প্রকৃতপক্ষে, বেশ কয়েকটি পদ্ধতিগত ঝুঁকির কারণে ব্যাংকগুলি নবায়নযোগ্য খাতে ঋণ দিতে দ্বিধা করে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেখেছে, নবায়নযোগ্য খাতের প্রকল্পগুলো ৫ বছর সময়সীমায় ঋণ পরিশোধ করতে পারে না; ঋণ পরিশোধে তারা ১০ হতে ১৫ বছর সময় নেয়। এ কারণে, তারা জামানত বেশী পরিমাণে দাবি করে; যা ছোট উদ্যোক্তারা দিতে পারে না। আবার, যেহেতু বেশিরভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির হার্ডওয়্যার সামগ্রী যথা – সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ইত্যাদি আমদানি করা হয়; তাই টাকার অবমূল্যায়নে প্রকল্প ব্যয় ২০ হতে ৩০% শতাংশ  বেড়ে যায়। ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ ফেরত পাবে কী-না, তাতে সন্দিহান হয়ে পড়ে। উপরন্তু, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর আর্থিক অবস্থা নিয়েও ব্যাংকগুলি উদ্বিগ্ন। যদি বিপিডিবি (বিদ্যুতের ক্রেতা)র ভর্তুকি টাকা আটকে যায়; তাহলে তারা সময়মতো ব্যাঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে, অবশ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কঠোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০২৬ সাল থেকে, ব্যাংকগুলিকে তাদের মোট ঋণের ৫% শতাংশ বিশেষভাবে সবুজ অর্থায়নের জন্য এবং ৪০% শতাংশ বৃহত্তর টেকসই অর্থায়নের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি ক্রেডিট রিস্ক গ্যারান্টি না থাকে, তাহলে এই উদ্দেশ্য পূরিত হবে না বলে আশঙ্কা রয়েছে। ক্রেডিট রিস্ক গ্যারান্টি হচ্ছে, কোনও নবায়নযোগ্য প্রকল্প ব্যর্থ হলে সরকার বা দাতা (বিশ্বব্যাঙ্ক) ক্ষতির একটি অংশ পূরণ করবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে এই ধরণের ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এটি নেই; যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে সরকারের আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অবশ্য, সরকার ইতোমধ্যে বেসরকারি এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ১০ বছরের কর ছাড়। ২০৩০ সালের আগে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা নতুন নবায়নযোগ্য বিদূৎকেন্দ্রগুলি প্রথম ১০ বছরের জন্য ১০০% শতাংশ কর ছাড় পাবে; তারপরে আরও ৫ বছরের জন্য আংশিক ছাড় পাবে। এছাড়াও, সরকার ২০২৫-২০২৬ বাজেটে ইনভার্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সৌর যন্ত্রাংশের উপর শুল্ক কমিয়েছে, যাতে প্রাথমিক খরচ কম হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে ছাদে সৌরশক্তি স্থাপন করা এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়ার নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সৌরশক্তিতে ব্যবসায়ীরা একটি কার্যকর বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিশেবে বিবেচনা করে।

কিছু প্রণোদনা সত্ত্বেও ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি)-র ধারাবাহিকতায় এনার্জি এন্ড পাওয়ার মাস্টার প্লান (ইপিএমপি) ২০২৬এ এলএনজি এবং কয়লার উপর বেশি জোর দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি, হাইড্রোজেন, এমোনিয়া কো-ফায়ারিং এবং সিএসএস ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। যা কোনক্রমেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নয়। বিশেষ করে এলএনজি অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য আমাদের বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করতে হবে। বিপরীতে, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ’গ্যারান্টি ক্লজ’ ধারাটি বাদ দিয়েছে। এই গ্যারান্টি ছাড়া, ব্যাংকগুলো নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিশেবে বিবেচনা করে; ফলে ডেভেলপারদের জন্য ঋণ পাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এছাড়াও  বর্তমানের জাতীয় গ্রিড নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌর/বায়ু) পরিবহনের জন্য উপযোগী নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘স্মার্ট গ্রিড’ আধুনিকীকরণের নীতি ২০৪০ সালের আগে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই।

উল্লেখ্য যে, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো ভারত ও নেপাল সৌর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে।  ভারত সরকার ছাদে সৌরশক্তি স্থাপনের জন্য ১ কোটি পরিবারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। এছাড়া, ভারতে সৌরশক্তির দাম একেবারে নীচে নেমে গেছে; যা প্রায় ক্ষেত্রেই গ্রিডের দামের তুলনায় সস্তা। আরও আছে সৌরশক্তি স্থাপনে কেন্দ্রীয় অনুদানের সাথে রাজ্য-স্তরের ভর্তুকি। এতে একটি পরিবারের সৌরশক্তি স্থাপনের খরচ মাত্র ৪০% শতাংশ বহন করতে হয়। আবার, ভারত সরকার প্রাইভেট বড় সৌর-বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট হতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে দুই টাকা ত্রিশ পয়সা হারে; সেখানে ছোট সৌর-বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো (৫ মেগাওয়াটের কম) হতে বিদ্যুৎ কিনছে তিন টাকা চল্লিশ পয়সা হারে। নেপাল ঐতিহ্যগতভাবে জল-বিদুত্যের জন্য পরিচিত, তবে সৌর-বিদ্যুৎ এখন অপরিহার্য হিশেবে দেখা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে, যখন নদীর জলস্তর কমে যায়, তখন সৌরশক্তি-ই তাদের একমাত্র ভরসা। এই সুযোগে নেপাল এ অঞ্চলে শক্তি (বিদ্যুৎ) রপ্তানিকারক দেশ হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। নেপাল সৌরশক্তি স্থাপন, উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করার পাশাপাশি নতুন আন্তঃসীমান্ত ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে আঞ্চলিক গ্রিডে (ভারত/বাংলাদেশ) তা বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়াও নেপাল সরকার ৩৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) সৌরশক্তি স্থাপনে উৎসাহিত করছে; যাতে বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে যথেষ্ট প্রণোদনা দিয়ে সৌর-বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি করেছে।

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত ছিল জনগণকে বিশেষ করে পরিবার পিছু সৌরশক্তি স্থাপন; এবং ছোট-বড় উদ্যোক্তাদের জন্য আরও উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ নেওয়া; দু:খের হচ্ছে, আমাদের নীতিতে তা একেবারেই অনুপস্থিত। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top