কপ ৩০: জলবায়ু অর্থায়ন কোন পথে?

গৌরাঙ্গ নন্দী

প্রতি বছর বিশ্বের একটি অন্যতম বড় কর্মযজ্ঞ হচ্ছে, জলবায়ু সম্মেলন। যাকে সাধারণভাবে কনফারেন্স অব পার্টি সংক্ষেপে কপ নামে অভিহিত করা হয়। কপ-এর ৩০তম বৈঠক বসেছে ব্রাজিলের বেলেম-এ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুনিয়াব্যাপী যে পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে; বিশেষত: বাতাসে কার্বন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও এ জাতীয় গ্যাসের অতিরিক্ত উপস্থিতিতে আবহাওয়াগত যে পরিবর্তন হচ্ছে; তা নিয়ন্ত্রণের উপায় ও কৌশল নিয়ে দেশগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে বৈঠক বসে। যেহেতু বিষয়টি বিজ্ঞান, সেই কারণে বিজ্ঞানী ও পরিবেশ-কর্মীরাও সেখানে জড়ো হয়ে দেশগুলোর পরিস্থিতি তুলে ধরেন। যেহেতু, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো ধনী ও উন্নত; পক্ষান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো গরীব, তাই সাম্প্রতিক কপ বৈঠকগুলোতে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে কীভাবে এবং কত পরিমাণ অর্থায়ন প্রয়োজন হবে।

এই ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে ১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্বনেতাদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল; সেবারে অবশ্য নাম দেওয়া হয়েছিল আর্থ সম্মেলন। মূল বিষয় ছিল পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হবে। শিল্পায়নের ফলে বিশেষত: বাতাসে অতিরিক্ত কার্বন নি:সরণের ফলে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা রুখতে হবে। বিজ্ঞানীদের উপস্থাপিত তথ্যমালায় আতঙ্কিত নেতৃবৃন্দ ঠিক করেন, বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রতি বছর বৈঠকে বসতে হবে। জাতিসংঘ এই বিষয়টি সমন্বয় করে থাকে। তাদের নেতৃত্বেই বিজ্ঞানী দল কাজ করেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। করণীয় ঠিক করা হয়। আনুষ্ঠানিক এই বাৎসরিক বৈঠকের ৩০তম বৈঠক এবারে সেই ব্রাজিলের আমাজান বন খ্যাত শহর বেলেম-এ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতি বছরের এই যে বিশাল আয়োজন, এতে অগ্রগতি কী? অগ্রগতি হচ্ছে,  জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের বৈশ্বিক বিপদ কী, সে সম্পর্কে আমরা সচেতন হতে পেরেছি। আমরা সকলেই মোটামুটি একমত হয়েছি যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার একটি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ যে কার্বন গ্যাস তার নিঃসরণ কমাতে হবে। এবং অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে দায়ী, ধনী-উন্নত দেশগুলোকে অপেক্ষাকৃত অনেক গরীব, অনুন্নত ও দ্বীপ-দেশগুলোর ক্ষয়-ক্ষতি কমিয়ে আনতে সহায়তা দিতে হবে। ধনী দেশগুলো ত সহজে সহায়তা দিতে চায় না; এ কারণে সহায়তার প্রক্রিয়া ও পরিমাণ নিয়েই বেশী কথাবার্তা হয়ে থাকে। এরমধ্যে কার্বন নিঃসরণের জন্য অন্যতম প্রধান দায়ী দেশ আমেরিকা এসব সমঝোতা, চুক্তি, ক্ষতিপূরণ, অর্থ-সহায়তা কিছুই প্রথম দিক থেকেই মানতে চায় না। কখনও কখনও সুর নরম করে, সহায়তায় সম্মত হয়; আবার কখনও কখনও সমঝোতা-চুক্তি প্রভৃতি হতে বেরিয়ে যেতে চায়। আগের বারে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি হতে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল; এবারেও যথারীতি ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি হতে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যা ২০২৬ হতে কার্যকর হওয়ার কথা। 

কপ-এর ইতিহাসে দুটো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় -একটি কিয়োটো প্রটোকল এবং অন্যটি প্যারিস সমঝোতা বা চুক্তি। প্যারিস সমঝোতা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই হিশেবে এ বছর প্যারিস সমঝোতার দশ বছর। এই সমঝোতা হতে আমেরিকা বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে। তারপরও অন্যান্য দেশগুলো জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছে। বিশেষত: ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনের জন্য অর্থায়নের বিষয়টিতে একটি সমঝোতা তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিস্ময়করভাবে এটিও সত্যি যে, অন্যান্য দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের এই যে, ক্ষয়-ক্ষতি প্রশমনের ধারণা, তারই আলোকে অনুন্নত তথা পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে সহায়তা করার নীতিমালা সাজিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বর্তমানে উন্নয়নের চিন্তাটি করা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের লেন্সে বিচার-বিশ্লেষণ করে। এ কারণে আমাদের মত দেশগুলোকে দেওয়া প্রকল্প সহায়তার অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। যদিও এই সংকটের জন্য দায়ী দেশগুলোর উচিত ছিল, দায় স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিশেবে এই সহায়তার অর্থ অনুদান দেয়া। কিন্তু না, সেখানেও অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, ব্যাংকের মাধ্যমে এবং যথারীতি ঋণ হিসেবে।  

ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন? এটি ঠিক করবার জন্য একটি পদ্ধতি বের করা হয়েছে। পদ্ধতিটি হচ্ছে, যেহেতু কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে; এ কারণে প্রতিটি দেশ নিঃসরণ কমানোর জন্য অঙ্গীকার করবে। কার্বন নিঃসরণ কমানো মানে, যে যে খাতগুলো হতে কার্বন নির্গত হয়, তার ব্যবহার কমিয়ে এনে বিকল্প ব্যবহার করা। যেমন, বিদ্যুত তেমনি একটি খাত, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রধানতঃ কয়লা ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করা হয়। এ কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। বললেই ত হবে না; জ্বালানি ত লাগবেই। পরিকল্পনাটি হতে হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমরা ধীরে ধীরে নবায়নযেfগ্য জ্বালানিতে সরে আসবো। এ জন্যে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনা দরকার। এই খাতে উন্নত দেশগুলো বিনিয়োগ করবে। আবার, জলবায়ু দুর্যোগে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেও সহায়তা প্রয়োজন। এসবের জন্য প্রতিটি দেশ স্বতন্ত্রভাবে নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা এবং এ খাতে কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করছে। একে বলা হচ্ছে, ইন্টেন্ডেড ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন বা আইএনডিসি। যাকে সচরাচর এনডিসি বলা হয়। এই এনডিসিতে স্ব-অর্থায়ন এবং কী পরিমাণ সহায়তা আশা করা হচ্ছে, তাও উল্লেখ করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি দেশের সহায়তা চাহিদার যোগফল-ই সম্মিলিত চাহিদা। বলা হচ্ছে, ২০৩৫ সালে জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা এক দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে হবে।   

ওই যে বলছিলাম, কপ-এ ক্ষয়ক্ষতিজনিত অর্থ সহায়তার বিষয়টি অন্যতম আলোচনার বিষয়; যা, এ বছরও আলোচনার অন্যতম বিষয়। এবারকার কপ বৈঠকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্যে একটি পথ-নকশা (রোড-ম্যাপ) চূড়ান্ত করার জন্য উপস্থাপিত হবে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই পথ-নকশা মানতে না পারেন, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি মেনে না নেন, যদি কোন চুক্তি স্বাক্ষরিত না হয়; এমনকি যদি কোন সমঝোতায়ও উপনীত না হয়; তবে এটি একটি অ-বাধ্যতামূলক প্রতিবেদনে পরিণত হতে পারে। কারণ, গত কপ বৈঠকে মাত্র ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। ৩০০ বিলিয়ন হতে এক দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের ব্যবধানটি বেশ। 

তিনশ’ বিলিয়ন হতে এক দশমিক তিন ট্রিলিয়ন ডলার তহবিলের এই রোডম্যাপটি মূলত: কপ ২৯ (আজারবাইজান) ও কপ ৩০ (ব্রাজিল)-এর সভাপতিদ্বয়ের যৌথ চেষ্টা। গত বছর এটি সূচিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদীয়মান বাজার এবং চীন বাদে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে জলবায়ু বিনিয়োগ ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে দুই দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৩.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি করতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা . ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে পারবো না। বলাইবাহুল্য, আমরা এখনও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অনেক দূরে রয়েছি।

এ কারণেই কপ ৩০এ বাংলাদেশের জন্য মূল অগ্রাধিকার হচ্ছে নতুন এবং পূর্বাভাসযোগ্য তহবিলটি কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা। পাশাপাশি ওই তহবিল সরাসরি স্থানীয় অভিযোজন কার্যক্রমে, যেমন কৃষক এবং মহিলানেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীগুলির হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। উন্নত দেশগুলো এই অর্থায়ন ঋণের মোড়কে দিতে চায়; কিন্তু ঋণের পরিবর্তে অনুদান হিশেবে যাতে পাওয়া যায়, তাতে জোর দিতে হবে; অন্ততপক্ষে নতুন অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রার কমপক্ষে অর্ধেক অভিযোজনের জন্য যাতে নির্দিষ্ট করা যায়, সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখা। স্থানীয় সরকার এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্থাগুলির জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলগুলিতে সরাসরি প্রবেশাধিকারের চেষ্টাটিও থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উপকূলীয় সম্প্রদায় এবং জেলেদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলির কার্যকর অংশগ্রহণের ব্যবস্থাটিও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও বাণিজ্য, কৃষি, জ্বালানি এবং কর্মসংস্থান নীতি সহ বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্ম-কৌশলে জলবায়ু কর্মকাণ্ডকে একীভূত করতে হবে। শিল্পে সবুজ প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। নতুন দক্ষতা এবং চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং যুব নারীদের সবুজ অর্থনীতিতে যুক্ত করতে হবে। দেশের হালনাগাদ করা জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি)-এর সাথে নীতিগত সমন্বয় জোরদার করতে হবে। বলাই বাহুল্য যে, বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, খুবই সামান্য পরিমাণে নিঃসরণ করে থাকে। ফলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top