গৌরাঙ্গ নন্দী
পাইকগাছার কপোতাক্ষ পাড়ের শিববাটি এলাকা। নদীর ধারের এই জায়গাটিতে অনেকগুলো ঘের, কেউ কেউ আবার পুকুরও বলে থাকেন। এলাকাবাসী এসব ঘের বা পুকুরে দীর্ঘদিন ধরে কাঁকড়ার চাষ করছেন। এমনি একজন চাষী রঞ্জন কুমার মন্ডল (৩৮)।
কয়েক বন্ধুর সাথে মিলেমিশে তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। যৌথ কারবারিতে সুবিধা করতে না পেরে নিজে হ্যাচারি করার উদ্যোগ নেন। তাতেও নানা ধরণের বিপত্তি দেখা দেয়। এমন সময় পাইকগাছা লোনা পানি গবেষণা কেন্দ্র থেকে কাঁকড়া চাষের ওপর কয়েক দফা প্রশিক্ষণ নেন। শুরু করেন কাঁকড়া ফ্যাটেনিং বা কাঁকড়ার চাষ।
নিজের পাঁচ কাঠা জমির ওপর একটি পুকুরে তিনি কাঁকড়ার চাষ করছেন। এরও বয়স দশ-বারো বছর হবে। এই সময়জুড়ে তিনি এটাই করেন। এই তাঁর আয়ের পথ। নিজের স্ত্রী, একটি ছেলে, একটি মেয়ে এবং মাকে নিয়ে তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ, ছেলেমেয়েদের লেখোপড়ার খরচ এতেই চলে। ’কেমন আয় হয়’ -জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’আয় সবসময় সমান হয় না; কখনও বেশী হয়, কখনও কম হয়; তবে যা হয়, তাতে সংসার চলে যায়।’ টাকার অংকে এই আয়ের পরিমাণ কেমন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’মাসে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা আয় হয়।’
আয়ের হেরফের সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ’গত সপ্তাহেও (মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে) তিনি কাঁকড়া বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি সাতশো টাকা; আর বর্তমানে (জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ) তার দাম চারশো টাকা। এই দাম কমে যাওয়া মানে আয় কম হওয়া। কারণ উৎপাদন খরচতো কমছে না বরং দিনে দিনে বাড়ছে।’
এখানকার প্রায় সকলেই সারা বছর কাঁকড়ার চাষ করেন। তবে দশ বছরেরও বেশী সময়ের কাঁকড়া চাষী রঞ্জন বলেন, ’জ্যৈষ্ঠ থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত কাঁকড়া ভালো চাষ হয়।’ অপুষ্ট কাঁকড়া যেগুলো রপ্তানী করা যায়না, সেইগুলো তিনি ফড়িয়াদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে তাঁর ঘেরে ছাড়েন; সেইগুলোকে পুষ্ট করে তিনি বাজারে বিক্রি করেন। কিঙ্কর মন্ডলও একইভাবে কাঁকড়া চাষ করেন। শিববাটি এলাকায় বিঘে খানেক জমির ওপর তাঁর সাতটি পুকুর। যাতে তিনি কাঁকড়া চাষ করে চলেছেন বছর দশেক হবে। তিনি বলেন, ’আয় খারাপ না, চলে যায়।’ যেহেতু কাঁকড়া রপ্তানী হয় এবং তাজা কাঁকড়া রপ্তানী করতে হয়। একারণে কাঁকড়া মরে গেলে ক্ষতি বেশী। আর দাম সবসময় ওঠানামা করে। এই দাম ওঠানামা সত্যি বিদেশের বাজারের কারণে, না-কি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে হয়; তা তাঁরা জানেন না।
পাল্টে যাওয়া চালচিত্র
একদা যে বাঁধ দেয়া হয়েছিল নোনা পানি ঠেকানোর জন্যে, পরবর্তীতে সেই বাঁধ কেটে নোনা পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে শুরু হওয়া এই চিংড়ি চাষ ছিল বাঁধের বাইরে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকায়। বিদেশী বাজার এবং অধিক মুনাফা থাকায় ১৯৮২, ’৮৩ সালের দিকে এর প্রসার বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সাতক্ষীরা, খুলনা এবং বাগেরহাট জেলায় চিংড়ি চাষের স¤প্রসারণ ঘটে। সামাজিক দ্ব›দ্ব-সংঘাত-বৈরিতা ছাড়াও নোনা পানি আটকে বছরের পর বছর চিংড়ি চাষ করায় মাটি ও পানিতে ভয়াবহ মাত্রায় লবণাক্ততা বেড়েছে। আর নোনার প্রতিক্রিয়ায় কৃষি উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে।
লবণাক্ততার কারণে কেউ চাইলেও সহসা এসব জমিতে চিংড়ি চাষের পরিবর্তে অন্য কিছু চাষ করতে পারেনা। জমিকে অন্য ফসল চাষের উপযোগী হতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে এবং প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হতে হবে। যাতে বৃষ্টির পানির চাপে মাটির লবণাক্ততা ধুয়ে এবং মাটির গভীরে গিয়ে মাটির উপরের স্তরের লবণাক্ততা কমে যেতে পারে। একবার যে জমি চিংড়ি চাষের আওতায় আসে, তা আর চিংড়ি চাষ মুক্ত হতে পারেনা। বরং চিংড়ি চাষের ফলে পাশের জমিও লবণাক্ততার শিকার হয়। এবং ঐ জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পায়। এতে পরের মৌসুমে পাশের জমিতেও চিংড়ি চাষ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকেনা। এভাবেই চিংড়ি চাষ এলাকার স¤প্রসারণও ঘটেছে।
এই অতিরিক্ত মাত্রার নোনা পানিতে অনেকেই কাঁকড়ার চাষ বা ফ্যাটেনিং করছেন। অবশ্য, কাঁকড়ার চাষ ও ফ্যাটেনিংএর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কাঁকড়া ফ্যাটেনিংকেই চাষ নামে অভিহিত করা হয়। কাঁকড়ার চাষ বলতে ছোট আকারের কাঁকড়াকে মোহনাঞ্চলের ঘেরে তিন থেকে ছয় মাস রেখে বাজারে বিক্রি করার উপযুক্ত করাকে বুঝায়। এক্ষেত্রে কাঁকড়া খোলস পাল্টাবে এবং কাঁকড়ার বৃদ্ধি হবে। পক্ষান্তরে ফ্যাটেনিং-এর ক্ষেত্রে বাজারে বিক্রির উপযুক্ত আকারের অপরিপক্ক কাঁকড়াকে দুই থেকে চার সপ্তাহ ঘেরে রেখে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কাঁকড়ার বিশেষ কয়েকটি জৈবিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। এই সময়ে কাঁকড়া খোলস পাল্টাবে না এবং বৃদ্ধিও হবে না।
অপরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়ার (গোনাড পরিপুষ্টভাবে তৈরি হয়নি এমন কাঁকড়া) আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা নেই বিধায় এগুলোকে ঘেরে ২-৪ সপ্তাহ রেখে ভালো খাবার সরবরাহ করা হয় যাতে এগুলো পরিপক্ক হয় অর্থাৎ গোনাড পরিপুষ্টভাবে তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়ার চাহিদা ও মূল্য অনেক বেশী। কাঁকড়া সাধারণত: মাংশাসী খাবার যেমন শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি ও অন্যান্য কাঁকড়া এবং মাছ খেতে পছন্দ করে। এতদাঞ্চলে শামুক ঝিনুকের বহুবিধ ব্যবহার ও অপর্যাপ্ত প্রাপ্যতা এবং ট্রাশফিশ সহজলভ্য না হওয়ায় চাষীরা ফ্যাটেনিং-এর ক্ষেত্রে সাধারণত: কাঁকড়ার খাবার হিসেবে তেলাপিয়া মাছ ব্যবহার করে। এর উৎপাদন খরচ বেশী হওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে যায়। আবার খাবার কম দিলে পরিপুষ্ট হতে সময় বেশী লেগে যায়। কাঁকড়া ক্ষুধার্ত থাকায় পা/চিমটা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পুকুর নির্বাচন
কাঁকড়ার জন্যে দো-আঁশ বা পলি দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। পুকুরের আয়তন ০.১ Ñ ১.০ হেক্টরের মধ্যে হলে ভালো হয়। পুকুরের আয়তন ছোট হলে কাঁকড়া মজুদ করতে সুবিধা হয়। তাছাড়া ব্যবস্থাপনার দিক দিয়েও সুবিধা। নোনা পানির উৎসস্থল যেমন নদী বা সমূদ্রের কাছে হলে খুবই ভালো হয়। এতে জোয়ার-ভাটার সাথে পানি ওঠানো-নামানো যায়। পুকুরের পানি উত্তোলনের জন্যে গেট থাকা ভালো। কাঁকড়ার পলায়নপর স্বভাবের জন্যে প্রায় ১.৫ মিটার উচ্চতার বাঁশের বানা (পাটা) দিয়ে পুকুরের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়। বানা প্রায় আধা মিটার মাটির নীচে পুঁতে দিতে হয়, যাতে কাঁকড়া পুকুরের পাড় গর্ত করে পালিয়ে যেতে না পারে। মাটির পিএইচ-এর ওপর ভিত্তি করে পাথুরে চুন (ঈধঈঙ৩) গুড়া করে সারা পুকুরে ছিটিয়ে দেয়া হয়। মাটির পিএইচ ৭ থেকে ৭.৫এর মধ্যে থাকলে হেক্টর প্রতি ১২৫ কেজি পাথুরে চুন দিতে হবে। চুন ছিটানোর পর পুকুরে জোয়ারের পানি তুলতে হবে এবং সাত দিন পর হেক্টর প্রতি ৭৫০ কেজি জৈব সার (গোবর) প্রয়োগ করতে হবে। জৈব সার প্রয়োগের তিন দিন পর হেক্টর প্রতি ২৫ কেজি ইউরিয়া এবং ১৫ কেজি টিএসপি সার প্রয়োগ করা হয়। অজৈব সার প্রয়োগের ৩-৪ দিন পর পুকুরে কাঁকড়া মজুদ করা হয়।
কাঁকড়া মজুদ ও খাদ্য প্রয়োগ
ফ্যাটেনিং-এর জন্যে প্রতি হেক্টর ঘেরে ১০,০০০টি অপরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়া মজুদ করা যায়। কাঁকড়ার ওজন ১৮০ গ্রাম বা তার বেশী হলে ভালো হয়। কারণ এই ওজনের কাঁকড়ার দাম সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়। মজুদের পর কাঁকড়ার জন্যে নিয়মিত খাবার দিতে হবে।
কাঁকড়ার খাবার হিসেবে শতকরা ২৫ ভাগ তেলাপিয়া মাছ এবং ৭৫ ভাগ গরু/ছাগলের ভুরি অথবা শতকরা ৫০ ভাগ তেলাপিয়া মাছ এবং ৫০ ভাগ বাগদা চিংড়ির মাথা (মাংশল অংশ) প্রতিদিন পুকুরে সরবরাহ করতে হবে। কাঁকড়ার দেহের ওজনের ৮% হারে প্রথম সাতদিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে ৫% হারে খাবার সরবরাহ করলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়। ফ্যাটেনিং-এর ক্ষেত্রে বৃদ্ধি নয়, বরং গোনাডের পরিপুষ্টতাই মুখ্য বিষয়।
পানি ব্যবস্থাপনা
পুকুরে কাঁকড়ার খাবার হিসেবে প্রচুর পরিমাণে প্রাণীজ মাংসালো খাদ্য সরবরাহ করতে হয়, যা দ্রুত পচনশীল। তাই কাঁকড়ার পুকুরের পানির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার সরবরাহ করলেও পানি নষ্ট হতে পারে। পানির গুণাগুণ যাতে নষ্ট না হয় সেকারণে এবং প্রয়োজনবোধে অমাবশ্যা বা পূর্ণিমার ভরা জোয়ারের সময় চার থেকে সাতদিন কাঁকড়ার পানি পরিবর্তন করতে হবে।
স্ত্রী কাঁকড়ার গোনাড পরীক্ষা ও আহরণ
কাঁকড়া মজুদের দশদিন পর থেকে দু’-তিনদিন পর পর কাঁকড়ার গোনাড পরিপুষ্ট হয়েছে কি-না তা পরীক্ষা করতে হয়। কাঁকড়াকে আলোর বিপরীতে ধরে দেখতে হবে যে, কাঁকড়ার ভেতর দিয়ে আলো অতিক্রম করে কিনা। যদি কাঁকড়ার ভিতর দিয়ে আলো অতিক্রম করতে না পারে তাহলে বুঝতে হবে গোনাড পরিপুষ্ট হয়েছে। বিপরীতে গোনাড পরিপুষ্ট না হলে কাঁকড়ার দুই পাশের পায়ের গোড়ার দিক দিয়ে আলো অতিক্রম করবে। সাধারণত: গোনাড পরিপুষ্ট হলে পুকুরে পানি উঠানোর সময় কাঁকড়া গেটের কাছে চলে আসে। পুষ্ট কাঁকড়া স্কুপনেট বা টোপ দিয়ে প্রলুব্ধ করে ধরতে হবে। কাঁকড়া সম্পূর্ণভাবে আহরণের জন্যে পুকুরের পানি নিষ্কাশন করতে হবে। ধরার সাথে সাথে কাঁকড়াকে বিশেষ নিয়মে বেঁধে ফেলতে হবে। অন্যথায় কাঁকড়ার চিমটা পা ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
খুলনার পাইকগাছা ও সাতক্ষীরার দেবহাটা কাঁকড়া চাষ বা ফ্যাটেনিং বহুল প্রচলিত। অনেক মানুষই এখন বিকল্প আয়ের চিন্তা থেকে কাঁকড়া ফ্যাটেনিং বা কাঁকড়ার চাষ করছেন। তাঁদের আয়ও খারাপ হচ্ছে না। #
খুলনা; জুন ০১, ২০১০
