নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব

WhatsApp-Image-2026-07-08-at-9.15.03-PM-1.jpeg

গত ৮ জুলাই (বুধবার) জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স-এর এলডি হলে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি, জলবায়ু ও ’পরিবেশের সবুজায়নে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক নীতি-সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন।

 

গত ৮ জুলাই (বুধবার) জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স-এর এলডি হলে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি, জলবায়ু ও ’পরিবেশের সবুজায়নে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক নীতি-সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন।

ঢাকা, বাংলাদেশ । ৮ জুলাই ২০২৬: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং দেশের অর্থনীতিকে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জরুরি নীতি-সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট (বিডাব্লিউজিইডি)। সংগঠনটি বলেছে, বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আর আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। এখন প্রয়োজন দ্রুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি।

বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সম্মানিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে এক নীতি সংলাপে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা সুরক্ষার বিষয়। টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে হবে।”

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ ও টেকসই জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে সংগঠনের পক্ষ থেকে সাত দফা নীতি-প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, এনবিআরের বৈষম্যমূলক এসআরও বাতিল, ২৫ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, গৃহস্থালি ও কৃষি-সৌরবিদ্যুতে ৩ কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমিতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প, ‘সবুজ জেলা’ কর্মসূচি, ১০ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন সৌর প্রকল্পে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ বাধ্যতামূলক করা।

বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের সরকারি লক্ষ্য রয়েছে। এই ব্যবধান পূরণে শুধু বড় বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না; বরং সাধারণ পরিবার, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের মূল অংশীদার করতে হবে।

চলতি বাজেটে সৌর সরঞ্জামের ওপর কর-ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জারি করা একটি এসআরও সেই সুবিধাকে কেবল দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে। ফলে গৃহস্থালি ছাদ সৌরবিদ্যুৎ, সৌরসেচ, সৌরভিত্তিক পানি সরবরাহ এবং কৃষিভিত্তিক সৌর উদ্যোগগুলো কার্যত কর-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক এসআরও অবিলম্বে বাতিল করে সকল নাগরিকের জন্য সমান কর-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান সবুজ রূপান্তর তহবিল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে খুবই সীমিত ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ২৫ হাজার কোটি টাকার (২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) একটি ঘূর্ণায়মান নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

গৃহস্থালি ও কৃষি-সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরাসরি সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন। বিডব্লিউজিইডি এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, “প্রতি ১ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে পারে। তাই ৩ কিলোওয়াট পর্যন্ত গৃহস্থালি ও কৃষি-সৌরবিদ্যুতে প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি দিলে তা সরকারের জন্য ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের কার্যকর বিনিয়োগ হবে।” নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ প্রণোদনারও আহ্বান জানানো হয়।

অতীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা ১৪ হাজার ১৬৬ একর অব্যবহৃত জমি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা হলে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াই প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি যেসব জেলায় এখনও কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই, সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ‘সবুজ জেলা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। সংগঠনটির মতে, সময়োপযোগী নীতি-সহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি ২০৫০ সালের শতভাগ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির দিকেও দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে।

 বিডব্লিউজিইডি উত্থাপিত সাতটি দাবি হচ্ছে:

১. রাজস্ব বোর্ডের বিদ্যমান এসআরও বাতিল করে সকল আমদানিকারকের জন্য করছাড়ের সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে যাতে  কোনো নাগরিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বৈষম্যের শিকার না হন।

২. নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন করতে হবে যা বাংলাদেশ ব্যাংক বিনাসুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোক্তাদের প্রদান করবে। এক্ষেত্রে পুনর্তহবিল নয় (Refinancing) বরং পূর্বতহবিল (Pre-Financing) সরবরাহ করতে হবে।

৩. নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে বাজেটে আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা (২০০ মার্কিন ডলার) সরাসরি ভর্তুকি বরাদ্দ করতে হবে। বৈষম্য দূর করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে অতিরিক্ত ১০% ভর্তুকি দেয়া প্রয়োজন।

৪. কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণকৃত এবং এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে এমন ১৪ হাজার ১৬৬ একর জমি সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের জন্য বরাদ্দ দিয়ে কমপক্ষে ৬ হাজার মেগাওয়াট সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।

৫. দেশের ছোট জেলাগুলোতে পরীক্ষামূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ‘সবুজ জেলা’ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে যা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের সুনাম তৈরি করবে।

৬. স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর দশ লক্ষ পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর ও জনশক্তি বিভাগের উদ্যোগে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে উচ্চ-দক্ষতার কাজে বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।

৭. নতুন অনুমোদিত সকল ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পের সাথে ন্যূনতম ২০ শতাংশ ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top